
কাজের সুযোগ আর সম্ভাবনার স্বপ্ন নিয়ে একসময় যারা জাপানে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কঠিন বাস্তবতা আর সরকারের নতুন ভিসানীতির কারণে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায়। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ইয়েন এবং নতুন পাস হওয়া কঠোর ভিসা নিয়মের মুখে বহু প্রবাসী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করছেন।
সম্প্রতি কার্যকর হওয়া নতুন আইন অনুযায়ী, প্রবাসীদের জন্য ভিসা নবায়ন ও স্থায়ী বসবাসের (Permanent Residency) শর্ত বহুলাংশে কঠিন করা হয়েছে:
বিজনেস ম্যানেজার ভিসা: যেখানে আগে বিজনেসের জন্য ন্যূনতম ৫ মিলিয়ন ইয়েন মূলধনের প্রয়োজন হতো, তা বাড়িয়ে একলাফে ৩০ মিলিয়ন ইয়েন করা হয়েছে।
স্থায়ী বসবাসের আবেদন ফি: আগের ১০,০০০ ইয়েন থেকে ২০ গুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০০,০০০ ইয়েন।
অন্যান্য কঠোর শর্তাবলী: আবেদনকারীর বার্ষিক আয় হতে হবে অন্তত ৫৭.৫ লাখ ইয়েন (যা জাপানের গড় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি)। পাশাপাশি পেনশন কন্ট্রিবিউশন বৃদ্ধি এবং জাপানি ভাষায় দক্ষতার কঠোর বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে জাপানে বসবাসরত ব্রিটিশ উদ্যোক্তা সারাহ্ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আমরা সবসময় এখানে একটি লিমিটেড কোম্পানি (Godo Kaisha) গড়ার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু নতুন এই নিয়ম আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের স্বপ্নকে নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে।”
জাপানি পত্রিকা Nikkei-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই বিজনেসম্যানিজার ভিসাধারী ৯৫৩ জন বিদেশি নাগরিক জাপান ত্যাগ করেছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
অন্যদিকে, নতুন আইন ঘোষণার পর থেকে মাত্র পাঁচ মাসে বিজনেস ম্যানেজার ভিসার আবেদন ৯৬ শতাংশ কমে গেছে। ৩০ মিলিয়ন ইয়েনের বিশাল পুঁজির বাধ্যবাধকতাই এর মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কট্টরপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাচির সরকার এই কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তায় বলেন, “জাপানি নাগরিক এবং বিদেশি বাসিন্দা—উভয়েই যেন নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রেখে বসবাস করতে পারেন, সেজন্যই সরকার এই আদেশ জারি করেছে।”
জাপানি কর্মকর্তারা বলছেন, অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় জাপানে স্থায়ী বসবাসের ফি আগে অনেক কম ছিল, তাই এই সমন্বয় প্রয়োজনীয় ছিল।
সরকারের এই পদক্ষেপকে "মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করা এক সিদ্ধান্ত" আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দৈনিক Mainichi Shimbun।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, তীব্র শ্রমিক সংকট, কম জন্মহার এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির এই যুগে এমন সিদ্ধান্ত জাপানের অর্থনীতিকে ধাক্কা দেবে। ফুজিৎসুর প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্টিন শুলজ বলেন, “এমনিতেই দুর্বল ইয়েন এবং কম বেতনের কারণে বিদেশি দক্ষ কর্মী পাওয়া কঠিন ছিল। সরকারের এই নেতিবাচক সংকেত বড় বড় জাপানি কোম্পানির জন্য আন্তর্জাতিক মেধা আকর্ষণে আরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।”
এদিকে টোকিওর রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সেবামূলক খাতে প্রবাসীদের ওপর ইমিগ্রেশন পুলিশের নজরদারি ও অভিযান আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে বলেও অভিযোগ করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জাপানের দীর্ঘদিনের ‘ওয়েলকামিং’ বা অভিবাসীবান্ধব ভাবমূর্তি এখন বড় প্রশ্নের মুখে।